banner

আমরা প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করি – ইমেইল পাঠাই, ওয়েবসাইট ব্রাউজ করি, অনলাইনে ভিডিও দেখি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই ডেটা বা তথ্যগুলো কিভাবে এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে এত সহজে পৌঁছে যায়? হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা সার্ভার থেকে কিভাবে আমাদের ডিভাইসে চলে আসে পছন্দের গান বা ভিডিও? এই জটিল যোগাযোগ প্রক্রিয়ার পিছনে রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম বা মডেল। আর এই মডেলগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো OSI মডেল (OSI Model)

আজকের পোস্টে আমরা সহজ ভাষায় জানবো OSI মডেল আসলে কী, কেন এটি তৈরি করা হয়েছিল, এবং নেটওয়ার্কিং বোঝার জন্য এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ।

OSI মডেল আসলে কি? (What is the OSI Model?)

OSI এর পূর্ণরূপ হলো Open Systems Interconnection। এটি একটি ধারণাগত কাঠামো (Conceptual Framework) যা একটি নেটওয়ার্কিং সিস্টেমের বিভিন্ন কাজকে ৭টি ভিন্ন ভিন্ন স্তরে (Layer) ভাগ করে। ভাবুন, একটি বড় বিল্ডিং তৈরির সময় যেমন বিভিন্ন দল বিভিন্ন কাজ করে – কেউ ভিত্তি তৈরি করে, কেউ দেওয়াল তোলে, কেউ ইলেক্ট্রিকের কাজ করে, কেউ রং করে – ঠিক তেমনি OSI মডেল নেটওয়ার্ক কমিউনিকেশনের জটিল প্রক্রিয়াকে ছোট ছোট, পরিচালনাযোগ্য অংশে ভাগ করে দেয়।

এটি তৈরি করেছে International Organization for Standardization (ISO), যেন বিভিন্ন ধরণের কম্পিউটার এবং নেটওয়ার্ক ডিভাইস একে অপরের সাথে সহজে যোগাযোগ করতে পারে, প্রস্তুতকারক যেই হোক না কেন। OSI মডেল নিজে কোনো নির্দিষ্ট প্রোটোকল বা হার্ডওয়্যার নয়, বরং এটি একটি রেফারেন্স মডেল – একটি গাইডলাইন যা নেটওয়ার্কিং কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে সাহায্য করে।

কেন OSI মডেল গুরুত্বপূর্ণ? (Why is the OSI Model Important?)

যদিও বর্তমানে ইন্টারনেটে আমরা মূলত TCP/IP মডেল ব্যবহার করি, তবুও OSI মডেলের গুরুত্ব অনেক:

  1. স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (Standardization): OSI মডেল তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি নেটওয়ার্কিং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের মধ্যে সামঞ্জস্যতা আনা। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলার কারণে বিভিন্ন ডিভাইস সহজে একসাথে কাজ করতে পারে।
  2. শেখার সুবিধা (Easier Learning): নেটওয়ার্কিং একটি বেশ জটিল বিষয়। OSI মডেল এই জটিলতাকে ৭টি স্তরে ভাগ করে দেয়, ফলে প্রতিটি স্তরের কাজ আলাদাভাবে বোঝা সহজ হয়। এটি শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্কের আভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ বুঝতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
  3. সমস্যা নির্ণয় ও সমাধান (Troubleshooting): নেটওয়ার্কে কোনো সমস্যা হলে, OSI মডেল ব্যবহার করে বোঝা যায় সমস্যাটি ঠিক কোন স্তরে হতে পারে। যেমন, যদি আপনি ইন্টারনেট পেতেই না পারেন, তাহলে সমস্যাটি ফিজিক্যাল স্তরে (যেমন, ক্যাবল সংযোগ) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি ওয়েবসাইট না খোলে কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ ঠিক থাকে, সমস্যা অ্যাপ্লিকেশন বা ট্রান্সপোর্ট স্তরে হতে পারে। এটি সমস্যা খুঁজে বের করা এবং সমাধান করা সহজ করে তোলে।
  4. অন্যান্য মডেল বোঝার ভিত্তি (Foundation for Other Models): OSI মডেল ভালোভাবে বুঝলে, বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত TCP/IP মডেল এবং অন্যান্য নেটওয়ার্কিং কনসেপ্ট বোঝা অনেক সহজ হয়ে যায়।

OSI মডেলের ৭টি স্তর (The 7 Layers of the OSI Model)

OSI মডেলে ডেটা প্রেরক থেকে প্রাপকের কাছে যাওয়ার সময় ৭টি স্তরের মধ্যে দিয়ে যায়। প্রেরকের কম্পিউটারে ডেটা উপর থেকে নিচের স্তরগুলোতে নামে এবং প্রাপকের কম্পিউটারে নিচ থেকে উপরের স্তরগুলোতে ওঠে। প্রতিটি স্তর তার উপরের স্তরের জন্য নির্দিষ্ট সেবা প্রদান করে।

চলুন সংক্ষেপে প্রতিটি স্তর পরিচিত হই:

  1. অ্যাপ্লিকেশন স্তর (Layer 7: Application Layer):
    • এটি ব্যবহারকারীর সবচেয়ে কাছের স্তর। আমরা যে সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করে নেটওয়ার্কের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করি (যেমন: ওয়েব ব্রাউজার, ইমেইল ক্লায়েন্ট, ফেসবুক অ্যাপ) সেগুলো এই স্তরে কাজ করে।
    • উদাহরণ: আপনি যখন ব্রাউজারে কোনো ওয়েবসাইটের ঠিকানা (URL) টাইপ করেন বা ইমেইলে ‘Send’ বাটনে ক্লিক করেন, তখন আপনি এই স্তরের সাথে কাজ করছেন। প্রোটোকল যেমন HTTP, FTP, SMTP এখানে কাজ করে।
  2. প্রেজেন্টেশন স্তর (Layer 6: Presentation Layer):
    • এই স্তর ডেটাকে অ্যাপ্লিকেশন স্তরের জন্য বোধগম্য ফরম্যাটে রূপান্তরিত করে। একে ডেটার “অনুবাদক” বা “ফরম্যাটার” বলা যায়। ডেটা এনক্রিপশন/ডিক্রিপশন, কম্প্রেশন (ডেটার আকার কমানো) ইত্যাদি কাজ এখানে হয়।
    • উদাহরণ: নিশ্চিত করা যে প্রেরক ও প্রাপক যেন ডেটাকে একই ফরম্যাটে (যেমন: ASCII, JPEG, MP3) বুঝতে পারে। SSL/TLS এনক্রিপশনও এই স্তরের অংশ।
  3. সেশন স্তর (Layer 5: Session Layer):
    • দুটি ডিভাইসের মধ্যে কমিউনিকেশন সেশন তৈরি, ব্যবস্থাপনা এবং সমাপ্ত করার কাজটি করে এই স্তর। এটি নিশ্চিত করে যে ডেটা আদান-প্রদানের পুরো সময় সংযোগটি যেন ঠিক থাকে।
    • উদাহরণ: আপনি যখন কোনো ওয়েবসাইটে লগইন করেন, তখন একটি সেশন তৈরি হয় যা আপনাকে সাইটে সক্রিয় রাখে। লগআউট করলে সেশনটি বন্ধ হয়ে যায়।
  4. ট্রান্সপোর্ট স্তর (Layer 4: Transport Layer):
    • এই স্তর এন্ড-টু-এন্ড নির্ভরযোগ্য ডেটা ডেলিভারি নিশ্চিত করে। এটি বড় ডেটা ফাইলকে ছোট ছোট সেগমেন্টে (Segment) ভাগ করে এবং প্রাপকের কম্পিউটারে আবার সেগুলোকে একত্রিত করে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটোকল এখানে কাজ করে: TCP (নির্ভরযোগ্য কানেকশন) এবং UDP (দ্রুত কিন্তু কম নির্ভরযোগ্য)। এটি পোর্ট নম্বরের মাধ্যমে কোন অ্যাপ্লিকেশন ডেটা পাবে তা নির্ধারণ করে।
    • উদাহরণ: একটি বড় ফাইল ডাউনলোডের সময় যদি কিছু অংশ হারিয়ে যায়, TCP প্রোটোকল সেই অংশগুলো আবার পাঠানোর অনুরোধ করে। অনলাইন গেমিং বা স্ট্রিমিং এ অনেক সময় UDP ব্যবহৃত হয় দ্রুত ডেটা পাঠানোর জন্য।
  5. নেটওয়ার্ক স্তর (Layer 3: Network Layer):
    • এই স্তরের প্রধান কাজ হলো ডেটা প্যাকেটগুলোকে (Segments এখানে Packet নামে পরিচিত হয়) উৎস থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সেরা পথ (Routing) খুঁজে বের করা। এখানে লজিক্যাল অ্যাড্রেসিং (যেমন: আইপি অ্যাড্রেস – IP Address) ব্যবহৃত হয়। রাউটার এই স্তরের ডিভাইস।
    • উদাহরণ: আপনি যখন ঢাকা থেকে কক্সবাজার চিঠি পাঠাবেন, পোস্ট অফিস ঠিক করে কোন পথে চিঠি গেলে দ্রুত এবং সঠিকভাবে পৌঁছাবে। নেটওয়ার্ক স্তর ঠিক তেমনি ডেটা প্যাকেটের জন্য ইন্টারনেটে সেরা পথটি খুঁজে বের করে।
  6. ডেটা লিঙ্ক স্তর (Layer 2: Data Link Layer):
    • এই স্তর একই লোকাল নেটওয়ার্কের মধ্যে ডিভাইসগুলোর মধ্যে নির্ভরযোগ্য ডেটা ট্রান্সফার নিশ্চিত করে। এটি ফিজিক্যাল অ্যাড্রেসিং (যেমন: ম্যাক অ্যাড্রেস – MAC Address) ব্যবহার করে ডেটা ফ্রেমগুলোকে (Packets এখানে Frame নামে পরিচিত হয়) সঠিক ডিভাইসে পাঠায় এবং ফিজিক্যাল স্তরে হওয়া সম্ভাব্য ত্রুটি সনাক্ত ও সংশোধন করার চেষ্টা করে। সুইচ এই স্তরের ডিভাইস।
    • উদাহরণ: আপনার বাসার ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে আপনার ল্যাপটপ থেকে প্রিন্টারে ডেটা পাঠানোর কাজটি এই স্তর নিয়ন্ত্রণ করে, নিশ্চিত করে ডেটা যেন ল্যাপটপ থেকে রাউটার হয়ে প্রিন্টার পর্যন্ত সঠিকভাবে যায়।
  7. ফিজিক্যাল স্তর (Layer 1: Physical Layer):
    • এটি OSI মডেলের সর্বনিম্ন স্তর এবং এটি আসল হার্ডওয়্যারের সাথে সম্পর্কিত – যেমন ক্যাবল (Ethernet, Fiber Optic), ওয়্যারলেস সিগন্যাল (Wi-Fi), কানেক্টর, ভোল্টেজ ইত্যাদি। ডেটা এখানে বিট (0 এবং 1) আকারে ইলেক্ট্রিক্যাল বা অপটিক্যাল সিগন্যালে রূপান্তরিত হয়ে মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে পরিবাহিত হয়।
    • উদাহরণ: আপনার কম্পিউটারের ল্যান কার্ড, নেটওয়ার্ক ক্যাবল, হাব – এগুলো সবই ফিজিক্যাল স্তরের অংশ। ডেটা আসলে এই স্তরেই সিগন্যাল হিসেবে চলাচল করে।

বাস্তব উদাহরণ: একটি ইমেইল পাঠানো

ধরুন, আপনি আপনার বন্ধুকে একটি ইমেইল পাঠাচ্ছেন। OSI মডেল অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি কেমন হবে?

  1. আপনি ইমেইল ক্লায়েন্টে মেইল লিখে ‘Send’ চাপলেন (Application)।
  2. ডেটা স্ট্যান্ডার্ড ফরম্যাটে রূপান্তরিত হলো, হয়তো এনক্রিপ্ট হলো (Presentation)।
  3. আপনার ইমেইল সার্ভারের সাথে একটি কানেকশন বা সেশন তৈরি হলো (Session)।
  4. ইমেইলটি ছোট ছোট সেগমেন্টে ভাগ হলো, TCP পোর্ট নম্বর যুক্ত হলো (Transport)।
  5. প্রতিটি প্যাকেটে আপনার ও প্রাপকের IP অ্যাড্রেস যুক্ত হলো এবং রাউটার দিয়ে সেরা পথ নির্ধারিত হলো (Network)।
  6. লোকাল নেটওয়ার্কে পাঠানোর জন্য প্যাকেটে MAC অ্যাড্রেস যুক্ত হয়ে ফ্রেমে রূপান্তরিত হলো (Data Link)।
  7. ফ্রেমগুলো ইলেক্ট্রিক্যাল বা অপটিক্যাল সিগন্যালে (বিট) রূপান্তরিত হয়ে ক্যাবল বা বাতাসের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলো (Physical)।

প্রাপকের কম্পিউটারে ঠিক এর উল্টো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ডেটা ফিজিক্যাল স্তর থেকে অ্যাপ্লিকেশন স্তরে পৌঁছাবে এবং আপনার বন্ধু ইমেইলটি পড়তে পারবে।

শেষ কথা

OSI মডেল হয়তো সরাসরি ইন্টারনেটে ব্যবহৃত হয় না (সেই স্থানটি TCP/IP মডেলের), কিন্তু নেটওয়ার্কিং এর মৌলিক ধারণা তৈরি করার জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কিভাবে ডেটা একটি জটিল পথের মধ্যে দিয়ে চলাচল করে। যারা নেটওয়ার্কিং নিয়ে কাজ করতে বা শিখতে আগ্রহী, তাদের জন্য OSI মডেল বোঝাটা খুবই জরুরি একটি প্রথম ধাপ।

আশা করি, OSI মডেল সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছি। নেটওয়ার্কিং এর এই যাত্রা সবে শুরু! আগামী পোস্টগুলোতে আমরা নেটওয়ার্কিং এর আরও গভীরে যাবো। আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।

banner
Mohiuddin Ahmed
Mindful Programmer

Md Mohiudin Ahmed

Thanks for being here.

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter

Subscribe my Newsletter for new blog posts, tips & new photos. Let's stay updated!

Related Posts

banner

Leave a Comment

A hand in need

Mohiuddin Ahmed

Hey let's go one step at a time

Facebook

@2024-2025 All Right Reserved.