আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন যখন আপনি ব্রাউজারে একটি ওয়েবসাইটের ঠিকানা (যেমন www.google.com) টাইপ করেন, তখন ঠিক কিভাবে আপনার কম্পিউটার সেই নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটটি খুঁজে পায়? ইন্টারনেটের বিশাল জগতে লক্ষ লক্ষ ওয়েবসাইট রয়েছে। এদের মধ্যে থেকে সঠিকটি খুঁজে বের করার কাজটি কিন্তু বেশ চমকপ্রদ। এই কাজের পেছনের নায়ক হলো ডিএনএস (DNS) বা ডোমেইন নেম সিস্টেম (Domain Name System)। চলুন, সহজ ভাষায় জেনে নেই ডিএনএস কি এবং এটি ইন্টারনেট কিভাবে কাজ করে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেন।
ডিএনএস (DNS): ইন্টারনেটের ফোনবুক
সবচেয়ে সহজে বুঝতে গেলে, ডিএনএস-কে আপনি ইন্টারনেটের একটি বিশাল ফোনবুকের সাথে তুলনা করতে পারেন। আমরা মানুষেরা নাম মনে রাখতে বেশি অভ্যস্ত, সংখ্যা নয়। তাই আমরা google.com বা facebook.com-এর মতো নাম ব্যবহার করে ওয়েবসাইট ভিজিট করি। কিন্তু কম্পিউটার বা মেশিনগুলো এই নামগুলো সরাসরি বোঝে না। তারা বোঝে সংখ্যা, নির্দিষ্ট করে বললে আইপি অ্যাড্রেস (IP Address)।
প্রতিটি ওয়েবসাইট বা ইন্টারনেটে যুক্ত ডিভাইসের একটি ইউনিক সাংখ্যিক ঠিকানা থাকে, যাকে বলা হয় আইপি অ্যাড্রেস (যেমন: 172.217.160.142)। আপনি যখন ব্রাউজারে একটি ওয়েবসাইটের নাম লেখেন, ডিএনএস সেই নামের相对应的 সঠিক আইপি অ্যাড্রেসটি খুঁজে বের করে আপনার কম্পিউটারকে দেয়। এরপর আপনার কম্পিউটার সেই আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সার্ভার (যেখানে ওয়েবসাইটের ডেটা জমা থাকে) এর সাথে যুক্ত হয় এবং ওয়েবসাইট-টি আপনার স্ক্রিনে লোড হয়।
বাস্তব জীবনের উদাহরণ:
ধরুন, আপনি আপনার বন্ধুর বাড়ি যেতে চান। আপনার কাছে বন্ধুর নাম আছে, কিন্তু তার বাড়ির সঠিক ঠিকানা (প্লট নম্বর, রোড নম্বর, এলাকা) জানা নেই। এক্ষেত্রে আপনি হয়তো এমন কাউকে ফোন করবেন বা জিজ্ঞেস করবেন যিনি ঠিকানাটি জানেন, অথবা কোনো ডিরেক্টরি বা ম্যাপ ব্যবহার করবেন।
এখানে:
- আপনার বন্ধুর নাম = ওয়েবসাইটের নাম (Domain Name)
- বন্ধুর বাড়ির সঠিক ঠিকানা = আইপি অ্যাড্রেস (IP Address)
- যিনি ঠিকানা খুঁজে দিচ্ছেন বা ডিরেক্টরি/ম্যাপ = ডিএনএস (DNS)
ঠিক যেমন বন্ধুর নাম দিয়ে ঠিকানা খুঁজে বের করা হয়, তেমনি ডোমেইন নেম সিস্টেম ওয়েবসাইটের নাম (Domain Name) ব্যবহার করে তার আসল ঠিকানা (আইপি অ্যাড্রেস) খুঁজে বের করে দেয়।
ডিএনএস কিভাবে কাজ করে? (How DNS Works)
আপনি যখন ব্রাউজারে একটি ওয়েবসাইটের ঠিকানা টাইপ করে এন্টার চাপেন, পর্দার আড়ালে বেশ কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন হয়:
- Request পাঠানো: আপনার ব্রাউজার প্রথমে আপনার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP)-এর ডিএনএস সার্ভারকে (এদেরকে Recursive Resolver বলা হয়) একটি Request পাঠায় – “এই ডোমেইন নামের আইপি অ্যাড্রেস কি?”
- ক্যাশ (Cache) চেক: ডিএনএস রিজলভার প্রথমে নিজের ক্যাশ (Cache – অস্থায়ী মেমরি যেখানে আগের খুঁজে বের করা তথ্য জমা থাকে) চেক করে। যদি সেখানে ওই ডোমেইন নামের আইপি অ্যাড্রেস পাওয়া যায়, তবে সরাসরি সেটি ব্রাউজারকে পাঠিয়ে দেয়। এতে সময় বাঁচে।
- তথ্য খোঁজা (যদি ক্যাশে না থাকে): ক্যাশে না পেলে, রিজলভার ইন্টারনেটের অন্যান্য ডিএনএস সার্ভারগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু করে। এটি অনেকটা ধাপে ধাপে হয়:
- রুট সার্ভার (Root Server): প্রথমে রুট সার্ভারকে জিজ্ঞাসা করা হয়। রুট সার্ভার ডোমেইন নামের শেষ অংশ (যেমন .com, .org, .net – এদেরকে Top-Level Domain বা TLD বলে) দেখে বলে দেয় কোন TLD সার্ভারের কাছে যেতে হবে।
- টিএলডি সার্ভার (TLD Server): রিজলভার তখন সেই নির্দিষ্ট TLD সার্ভারকে (যেমন .com সার্ভার) জিজ্ঞাসা করে। TLD সার্ভার ডোমেইন নামের নিবন্ধনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে Authoritative Name Server-এর ঠিকানা দেয়।
- অথরিটেটিভ নেম সার্ভার (Authoritative Name Server): এই সার্ভারটি হলো আসল তথ্যভাণ্ডার। এর কাছেই ডোমেইন নামের সঠিক ও সর্বশেষ আইপি অ্যাড্রেস সংরক্ষিত থাকে। রিজলভার এই সার্ভার থেকে আইপি অ্যাড্রেসটি সংগ্রহ করে।
- Response পাওয়া: রিজলভার আইপি অ্যাড্রেসটি পেয়ে গেলে, সেটি আপনার ব্রাউজারকে পাঠিয়ে দেয়।
- ওয়েবসাইট লোড: ব্রাউজার এবার প্রাপ্ত আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট-এর সার্ভার-এর সাথে যোগাযোগ করে এবং সাইটটি লোড করে।
পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত (মিলিসেকেন্ডের মধ্যে) সম্পন্ন হয়, যার ফলে আমরা নির্বিঘ্নে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারি।
কেন ডিএনএস এত গুরুত্বপূর্ণ?
- সহজ ব্যবহার: ডিএনএস না থাকলে আমাদের প্রত্যেকটি ওয়েবসাইটের জন্য জটিল আইপি অ্যাড্রেস (যেমন 172.217.160.142) মনে রাখতে হতো, যা প্রায় অসম্ভব। ডিএনএস sayesinde আমরা সহজবোধ্য নাম ব্যবহার করতে পারি।
- নির্ভরযোগ্যতা: যদি কোনো ওয়েবসাইটের সার্ভার বা আইপি অ্যাড্রেস পরিবর্তন হয়, তবে শুধুমাত্র ডিএনএস রেকর্ডে সেই পরিবর্তন আনলেই চলে। ব্যবহারকারীদের নতুন করে কিছু মনে রাখার প্রয়োজন হয় না।
- গতি: ডিএনএস ক্যাশিং (Caching) পদ্ধতি ব্যবহার করার ফলে বারবার একই ওয়েবসাইটের আইপি খোঁজার প্রয়োজন হয় না, যা ব্রাউজিংকে দ্রুততর করে।
একটু টেকনিক্যাল দিক
যদিও মূল ধারণাটি সহজ, ডিএনএস সিস্টেমে আরও কিছু বিষয় রয়েছে:
- ডিএনএস রেকর্ডস (DNS Records): ডিএনএস সার্ভারে শুধু আইপি অ্যাড্রেসই (A Record for IPv4, AAAA Record for IPv6) থাকে না, আরও বিভিন্ন ধরনের তথ্য বা রেকর্ড থাকে। যেমন:
- CNAME Record: একটি ডোমেইন নামকে অন্য একটি ডোমেইন নামের দিকে নির্দেশ করে।
- MX Record: ইমেইল পাঠানোর জন্য মেইল সার্ভারের ঠিকানা নির্দেশ করে।
- NS Record: ডোমেইনটির Authoritative Name Server কোনটি তা নির্দেশ করে।
- Recursive vs Authoritative Servers:
- Recursive Resolver: এরাই ব্যবহারকারীর পক্ষ থেকে ডিএনএস কোয়েরি (Query) শুরু করে এবং তথ্য খুঁজে এনে দেয় (যেমন আপনার ISP-এর ডিএনএস সার্ভার)।
- Authoritative Server: এদের কাছেই ডোমেইন নামের মূল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকে এবং এরা চূড়ান্ত জবাব দেয়।
শেষ কথা
ডোমেইন নেম সিস্টেম (DNS) হলো ইন্টারনেটের একটি নীরব কিন্তু অপরিহার্য অংশ। এটি ছাড়া আজকের দিনের ইন্টারনেট ব্যবহার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। এই সিস্টেমটিই নিশ্চিত করে যে আমরা যখন একটি ওয়েবসাইট-এর নাম টাইপ করি, তখন যেন সঠিক সার্ভার-এর সাথে যুক্ত হতে পারি এবং ডিজিটাল দুনিয়ায় সহজে বিচরণ করতে পারি। আশা করি, ডিএনএস কি এবং এটি ইন্টারনেট কিভাবে কাজ করে তার একটি অংশ হিসেবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আপনারা বুঝতে পেরেছেন।
Primary Bengali Keyword(s):
- ডিএনএস কি (DNS ki)
- ডোমেইন নেম সিস্টেম (Domain Name System)
Secondary Bengali Keyword(s):
- আইপি অ্যাড্রেস (IP Address)
- ইন্টারনেট কিভাবে কাজ করে (Internet kivabe kaj kore)
- ওয়েবসাইট (Website)
- সার্ভার (Server)