আমরা প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করি, ফাইল ডাউনলোড করি, বন্ধুদের সাথে অনলাইনে যোগাযোগ করি। কিন্তু এই সংযোগগুলোর পেছনে কী ধরনের প্রযুক্তি কাজ করে, তা কি ভেবে দেখেছি? অনেক সময়ই আমরা একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে যুক্ত হই, যেমন কোনো ওয়েবসাইট ব্রাউজ করার সময়। কিন্তু এমন এক ধরনের শক্তিশালী প্রযুক্তি আছে যা কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক ছাড়াই ডিভাইসগুলোকে সরাসরি যুক্ত করে – এর নাম পিয়ার-টু-পিয়ার (Peer-to-Peer) নেটওয়ার্কিং বা সংক্ষেপে P2P প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি শুধুমাত্র দুটি কম্পিউটার যুক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি টরেন্ট কিভাবে কাজ করে এবং এমনকি বিটকয়েন ও ব্লকচেইন এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে। আসুন, এই fascinating প্রযুক্তি এবং এর কিছু যুগান্তকারী ব্যবহার সম্পর্কে জেনে নিই।
পিয়ার-টু-পিয়ার (P2P) নেটওয়ার্কিং কি? (পুনরালোচনা)
সহজ কথায়, পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কিং হলো এমন একটি মডেল যেখানে নেটওয়ার্কের প্রতিটি সদস্য (কম্পিউটার বা ডিভাইস, যাদের ‘পিয়ার’ বা সঙ্গী বলা হয়) সরাসরি একে অপরের সাথে যোগাযোগ এবং ডেটা আদান-প্রদান করতে পারে। এখানে কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভার বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হয় না।
এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো ডিসেন্ট্রালাইজেশন (Decentralization) বা বিকেন্দ্রীকরণ। ভাবুন, ক্লাসের সব নোট যদি শুধু একজন শিক্ষকের (কেন্দ্রীয় সার্ভার) কাছে থাকে, তবে তার অনুপস্থিতিতে বা কোনো সমস্যা হলে কেউই নোট পাবে না। কিন্তু যদি প্রত্যেক ছাত্র (পিয়ার) একে অপরের সাথে নোট বিনিময় করতে পারে, তবে কারো উপর এককভাবে নির্ভর করতে হয় না – এটাই P2P এর মূল ধারণা। আমরা আগের একটি পোস্টে দেখেছিলাম কিভাবে দুটি কম্পিউটারকে ইথারনেট ক্যাবল দিয়ে যুক্ত করে একটি ছোট P2P নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় ফাইল শেয়ারিংয়ের জন্য। এখন দেখব এই পি২পি প্রযুক্তি আরও বড় পরিসরে কিভাবে ব্যবহৃত হয়।
টরেন্ট কিভাবে কাজ করে? P2P ফাইল শেয়ারিংয়ের এক অনন্য উদাহরণ
আপনারা অনেকেই হয়তো ‘টরেন্ট’ (Torrent) শব্দটি শুনেছেন, বিশেষ করে বড় ফাইল (যেমন মুভি, গেম বা সফটওয়্যার) ডাউনলোড করার ক্ষেত্রে। টরেন্ট কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে পারলে P2P প্রযুক্তির একটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায়।
সাধারণ ডাউনলোডের ক্ষেত্রে, আপনি একটি ফাইল একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বা সার্ভার থেকে নামান। যদি সেই সার্ভার স্লো হয় বা বন্ধ হয়ে যায়, আপনার ডাউনলোডও বন্ধ হয়ে যাবে। টরেন্ট এই সমস্যার সমাধান করে পি২পি প্রযুক্তি ব্যবহার করে:
- ফাইলের বিভাজন: একটি বড় ফাইলকে টরেন্টে অসংখ্য ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয়।
- সরাসরি আদান-প্রদান: আপনি যখন একটি টরেন্ট ফাইল (.torrent এক্সটেনশনযুক্ত ছোট ফাইল, যা মূল ফাইলের তথ্য এবং ট্র্যাকার ঠিকানা ধারণ করে) ব্যবহার করে ডাউনলোড শুরু করেন, আপনার কম্পিউটার একই ফাইল ডাউনলোড করছে এমন অন্যান্য অনেক ব্যবহারকারীর (পিয়ারস) সাথে সরাসরি যুক্ত হয়।
- সিডার (Seeder) ও পিয়ার (Peer): যারা সম্পূর্ণ ফাইলটি ডাউনলোড করে ফেলেছেন এবং অন্যদের আপলোড করছেন, তাদের সিডার বলা হয়। যারা এখনো ডাউনলোড করছেন এবং একই সাথে ডাউনলোাড করা অংশগুলো অন্যদের আপলোড করছেন, তাদের পিয়ার বা লিচার (Leecher) বলা হয়। এই সিডার ও পিয়ারদের সম্মিলিত নেটওয়ার্ককে বলে সোয়ার্ম (Swarm)।
- ট্র্যাকার (Tracker): এটি একটি সার্ভার যা সোয়ার্মে থাকা সিডার ও পিয়ারদের খুঁজে পেতে সাহায্য করে ( অনেকটা ফোনবুকের মতো)। তবে ট্র্যাকার নিজে ফাইলের কোনো অংশ হোস্ট করে না। (কিছু আধুনিক টরেন্ট ট্র্যাকার ছাড়াও কাজ করতে পারে ডিস্ট্রিবিউটেড হ্যাশ টেবিল বা DHT ব্যবহার করে)।
উদাহরণ: ধরুন, একটি বিশাল জনসমাবেশে (সোয়ার্ম) একটি বইয়ের (ফাইল) শত শত কপি টুকরো টুকরো করে (ফাইলের অংশ) বিভিন্ন মানুষের (সিডার ও পিয়ার) কাছে ছড়িয়ে দেওয়া আছে। আপনি বইটি সম্পূর্ণ করতে চাইলে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাগুলো (ফাইলের অংশ) যাদের কাছে আছে, তাদের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করবেন। একই সাথে আপনার কাছে থাকা পৃষ্ঠাগুলোও অন্যদের দেবেন। কে কোথায় আছে বা কার কাছে কোন পৃষ্ঠা থাকতে পারে, সেই তথ্য পেতে একজন সাহায্যকারী (ট্র্যাকার) আপনাকে সহায়তা করতে পারে। এভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুব দ্রুত সম্পূর্ণ বইটি (ফাইল) আপনার কাছে চলে আসবে।
এই পদ্ধতিতে ডাউনলোড অনেক দ্রুত হয় কারণ আপনি একই সময়ে অনেকের কাছ থেকে ফাইলের অংশ পান। আর কোনো একজন ব্যবহারকারী অফলাইনে চলে গেলেও ডাউনলোড বন্ধ হয় না, কারণ আরও অনেকে থাকে ফাইলটি শেয়ার করার জন্য। এটাই টরেন্ট কিভাবে কাজ করে তার মূলনীতি – একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল ফাইল শেয়ারিং পদ্ধতি, যার মূলে রয়েছে পি২পি প্রযুক্তি।
বিটকয়েন ও ব্লকচেইন: P2P প্রযুক্তির যুগান্তকারী ব্যবহার
সাম্প্রতিক সময়ে বিটকয়েন (Bitcoin) এবং এর পেছনের প্রযুক্তি ব্লকচেইন (Blockchain) নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এটি ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency) এবং নিরাপদ ডেটা সংরক্ষণের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই দুটি প্রযুক্তির ভিত্তিও হলো পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কিং।
ব্লকচেইনকে বলা যেতে পারে একটি ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার (Distributed Ledger) বা বণ্টিত খতিয়ান। এটি একটি বিশেষ ধরনের ডেটাবেস যা লেনদেন বা তথ্যের রেকর্ড নিরাপদে এবং স্বচ্ছভাবে সংরক্ষণ করে। বিটকয়েন ও ব্লকচেইন কিভাবে P2P ব্যবহার করে?
- ডিসেন্ট্রালাইজড নেটওয়ার্ক: বিটকয়েন কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। এর বদলে, বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার কম্পিউটার (যাদের নোড (Node) বলা হয়) একটি বিশাল P2P নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে। প্রতিটি নোড সম্পূর্ণ ব্লকচেইনের (অর্থাৎ শুরু থেকে সমস্ত লেনদেনের ইতিহাস) একটি কপি সংরক্ষণ করে।
- লেনদেন প্রক্রিয়া: যখন কেউ বিটকয়েন পাঠায়, সেই লেনদেনের তথ্য নেটওয়ার্কের সকল নোডের কাছে প্রচারিত হয়।
- যাচাইকরণ ও ব্লক তৈরি: নোডগুলো লেনদেনটি যাচাই করে (যেমন, প্রেরকের অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট বিটকয়েন আছে কিনা)। বৈধ লেনদেনগুলো একত্রিত করে একটি ‘ব্লক’ তৈরি করা হয়।
- ব্লকচেইনে যুক্ত হওয়া (মাইনিং/কনসেনসাস): নতুন ব্লকটিকে ক্রিপ্টোগ্রাফিক্যালি সুরক্ষিত করে বিদ্যমান চেইনের সাথে যুক্ত করার একটি প্রক্রিয়া আছে (যেমন বিটকয়েনের ক্ষেত্রে ‘মাইনিং’)। একবার একটি ব্লক চেইনে যুক্ত হয়ে গেলে, তা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। যেহেতু প্রতিটি নোডের কাছে লেজারের কপি থাকে এবং নতুন ব্লক যুক্ত করার জন্য বেশিরভাগ নোডের সম্মতি (কনসেনসাস) প্রয়োজন হয়, তাই কেউ একা একা তথ্য পরিবর্তন করতে পারে না।
উদাহরণ: একটি গ্রামের সবাই মিলে একটি যৌথ ডায়েরি (ব্লকচেইন/ ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার) রক্ষণাবেক্ষণ করে, যেখানে গ্রামের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব লেখা হয়। গ্রামের প্রতিটি পরিবারের (নোড) কাছে সেই ডায়েরির হুবহু একটি কপি থাকে। কেউ কোনো লেনদেন করলে তা গ্রামের সবাইকে (নেটওয়ার্ক) জানিয়ে দেওয়া হয়। সবাই মিলে যাচাই করে (ভ্যালিডেশন) যদি দেখে যে হিসাব ঠিক আছে, তবে সবাই একমত হয়ে (কনসেনসাস) নিজ নিজ ডায়েরিতে নতুন হিসাবটি লিখে নেয় এবং আগের হিসাবের সাথে এমনভাবে যুক্ত করে যেন তা পরিবর্তন করা না যায়। যেহেতু সবার কাছে একই কপি এবং নতুন কিছু লেখার জন্য সবার সম্মতি লাগে, তাই কেউ গোপনে ডায়েরিতে কারচুপি করতে পারে না। এর জন্য কোনো একক মোড়ল বা হিসাবরক্ষকের (কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ) প্রয়োজন হয় না।
এই ডিসেন্ট্রালাইজেশন, যা পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে, বিটকয়েন ও ব্লকচেইন কে স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং সেন্সরশিপ-প্রতিরোধী করে তুলেছে।
P2P প্রযুক্তির শক্তি ও ভবিষ্যৎ
পিয়ার-টু-পিয়ার প্রযুক্তির মূল শক্তি হলো এর বিকেন্দ্রীভূত প্রকৃতি। এটি ডেটা, কাজের চাপ বা নিয়ন্ত্রণকে একক কোনো বিন্দুর উপর নির্ভরশীল না রেখে নেটওয়ার্কের সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে সিস্টেমগুলো আরও স্থিতিশীল (resilient), কার্যকর (efficient) এবং অনেক ক্ষেত্রে সেন্সরশিপ-প্রতিরোধী হয়।
টরেন্ট এবং বিটকয়েনের মতো উদাহরণগুলো দেখায় যে একটি সাধারণ ধারণা – ডিভাইসগুলোর মধ্যে সরাসরি সংযোগ – কতটা শক্তিশালী হতে পারে। বর্তমানে এই প্রযুক্তি আরও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেমন – কিছু মেসেজিং অ্যাপে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপটেড যোগাযোগ, ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিং (যেখানে বড় গণনার কাজ অনেক কম্পিউটারে ভাগ করে দেওয়া হয়) ইত্যাদি। ভবিষ্যতে ডিসেন্ট্রালাইজেশন এর ধারণা আরও প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে P2P প্রযুক্তির নতুন নতুন ব্যবহার আমরা দেখতে পাব।
শেষ কথা
পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কিং একটি শক্তিশালী এবং বহুমুখী প্রযুক্তি। দুটি কম্পিউটারকে যুক্ত করার সাধারণ কাজ থেকে শুরু করে টরেন্ট কিভাবে কাজ করে তার মূলনীতি এবং বিটকয়েন ও ব্লকচেইন এর মতো বৈপ্লবিক প্রযুক্তির ভিত্তি – সবকিছুতেই পি২পি প্রযুক্তির অবদান অনস্বীকার্য। ডিসেন্ট্রালাইজেশন এর মাধ্যমে এটি যেভাবে ডেটা আদান-প্রদান এবং সিস্টেম পরিচালনার ধারণা বদলে দিয়েছে, তা সত্যিই অসাধারণ। এই প্রযুক্তি আমাদের ডিজিটাল বিশ্বকে প্রতিনিয়ত নতুন আকার দিচ্ছে।