প্রতিদিন আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করি – ফেসবুক স্ক্রল করা থেকে শুরু করে ইউটিউবে ভিডিও দেখা, বন্ধুদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলা, অথবা জরুরি তথ্য খোঁজা পর্যন্ত। ইন্টারনেট যেন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই অদৃশ্য জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ইন্টারনেট আসলে কিভাবে কাজ করে? কিভাবে এক ক্লিকের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের তথ্য আপনার ডিভাইসে চলে আসে? ব্যাপারটা বেশ জটিল মনে হলেও, এর পেছনের মূল ধারণাগুলো কিন্তু বেশ মজার এবং সহজ। চলুন, আজ ইন্টারনেটের সেই রহস্য ভেদ করা যাক একদম সহজ ভাষায়!
ইন্টারনেট: একটি বিশাল নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক সহজ কথায়, ইন্টারনেট হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি কম্পিউটার, সার্ভার, রাউটার এবং অন্যান্য ডিভাইসের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। একে বলা যেতে পারে “নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক”। কিন্তু এই ডিভাইসগুলো একে অপরের সাথে কিভাবে কথা বলে? এখানেই আসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।
১. ডেটা প্যাকেট (Data Packets): তথ্যের ছোট ছোট খাম যখন আপনি ইন্টারনেট থেকে কিছু ডাউনলোড করেন বা কোনো ওয়েবসাইটে ভিজিট করেন, তখন সম্পূর্ণ ডেটা একসাথে আসে না। বরং, সেই ডেটাগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে ফেলা হয়। এই প্রতিটি অংশকে বলা হয় প্যাকেট (Packet)।
- মনে করুন, আপনি একটি বিশাল বই ডাকযোগে পাঠাতে চান। পুরো বইটি একসাথে পাঠানো কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আপনি বইটির পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে আলাদা আলাদা খামে ভরলেন। প্রতিটি খামের উপর প্রাপকের ঠিকানা এবং আপনার ঠিকানা লিখে দিলেন, সাথে কোন খামে বইয়ের কত নম্বর পৃষ্ঠা আছে সেটাও উল্লেখ করলেন। ইন্টারনেটে ডেটা পাঠানোর প্রক্রিয়াটাও ঠিক এমনই। প্রতিটি প্যাকেটে মূল ডেটার একটি অংশ এবং কিছু নিয়ন্ত্রণ তথ্য (যেমন প্রেরক ও প্রাপকের ঠিকানা, প্যাকেটের ক্রমিক নম্বর ইত্যাদি) থাকে।
২. আইপি অ্যাড্রেস (IP Address): ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আপনার ঠিকানা ইন্টারনেটে সংযুক্ত প্রতিটি ডিভাইসের একটি নিজস্ব এবং অনন্য পরিচিতি নম্বর থাকে, যাকে বলা হয় আইপি অ্যাড্রেস (Internet Protocol Address)। এটি অনেকটা আপনার বাড়ির ঠিকানার মতো। এই অ্যাড্রেসের কারণেই ডেটা প্যাকেটগুলো সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।
- উদাহরণ: আইপি অ্যাড্রেস দেখতে সাধারণত এমন হয়:
192.168.1.1
(IPv4) অথবা আরো দীর্ঘ2001:0db8:85a3:0000:0000:8a2e:0370:7334
(IPv6)। যখন আপনি কোনো ওয়েবসাইটে ডেটা পাঠান বা সেখান থেকে ডেটা পান, তখন প্যাকেটগুলোতে আপনার ডিভাইসের আইপি অ্যাড্রেস (প্রেরক) এবং ওয়েবসাইটটির সার্ভারের আইপি অ্যাড্রেস (প্রাপক) লেখা থাকে।
৩. ডিএনএস (DNS): ইন্টারনেটের ফোনবুক আমরা নিশ্চয়ই মনে রাখতে পারবো না যে গুগলের আইপি অ্যাড্রেস 172.217.160.142
অথবা ফেসবুকের আইপি অ্যাড্রেস অন্য কিছু। আমরা মনে রাখি সহজ নামগুলো – google.com, facebook.com ইত্যাদি। এখানেই ডিএনএস (Domain Name System) এর কাজ।
- উদাহরণ: ডিএনএস হলো ইন্টারনেটের বিশাল এক ফোনবুক বা অ্যাড্রেস বুক। আপনি যখন ব্রাউজারে
www.google.com
টাইপ করেন, আপনার কম্পিউটার প্রথমে ডিএনএস সার্ভারকে জিজ্ঞাসা করে, “এই নামের আইপি অ্যাড্রেসটা কী?” ডিএনএস সার্ভার তখন এর ডেটাবেস থেকে খুঁজে সঠিক আইপি অ্যাড্রেসটি আপনার কম্পিউটারকে জানিয়ে দেয়। এরপরই আপনার কম্পিউটার সেই আইপি অ্যাড্রেসে ডেটা প্যাকেট পাঠাতে পারে।
৪. রাউটার (Router): ডেটা প্যাকেটের ট্র্যাফিক পুলিশ আপনার বাড়ি থেকে ডেটা প্যাকেটগুলো বের হয়ে বিশ্বভ্রমণে যায়। কিন্তু কোন পথে গেলে সবচেয়ে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে, সেটা কে ঠিক করে দেয়? এই কাজটি করে রাউটার (Router)।
- উদাহরণ: রাউটারকে তুলনা করা যেতে পারে চৌরাস্তার ট্র্যাফিক পুলিশ বা পোস্ট অফিসের সর্টিং সেন্টারের সাথে। যখন একটি ডেটা প্যাকেট রাউটারের কাছে আসে, রাউটার প্যাকেটের গায়ে লেখা গন্তব্যের আইপি অ্যাড্রেসটি দেখে। এরপর সে তার কাছে থাকা ম্যাপ (রুটিং টেবিল) দেখে ঠিক করে দেয় প্যাকেটটিকে পরবর্তী কোন পথে পাঠালে সেটি দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাবে। আপনার বাড়ির ওয়াইফাই রাউটার থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের গভীরে থাকা বিশাল এবং শক্তিশালী রাউটারগুলো – সবাই মিলে এই কাজটি করে।
৫. আইএসপি (ISP): আপনার ইন্টারনেট জগতে প্রবেশের দরজা আপনি সরাসরি ইন্টারনেটের বিশাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারেন না। আপনার সংযোগটি স্থাপন করে দেয় একটি আইএসপি (Internet Service Provider)। বাংলাদেশে যেমন গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি, লিংকথ্রি, অ্যাম্বার আইটি ইত্যাদি আইএসপি রয়েছে।
- উদাহরণ: আইএসপি হলো আপনার এলাকা থেকে মূল হাইওয়েতে ওঠার গেটওয়ে বা টোল প্লাজার মতো। আইএসপি আপনাকে একটি আইপি অ্যাড্রেস দেয় এবং তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আপনাকে ইন্টারনেটের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত করে। আপনার পাঠানো ডেটা প্যাকেটগুলো প্রথমে আইএসপির নেটওয়ার্কে যায়, তারপর সেখান থেকে অন্যান্য নেটওয়ার্ক ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছায়।
৬. টিসিপি/আইপি (TCP/IP): যোগাযোগের নিয়মকানুন এতক্ষণ আমরা ডেটা প্যাকেট, ঠিকানা, ফোনবুক, ট্র্যাফিক পুলিশ, গেটওয়ে – এসব নিয়ে কথা বললাম। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়াটি কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। ইন্টারনেটে যোগাযোগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মকানুনের সেট হলো টিসিপি/আইপি (Transmission Control Protocol/Internet Protocol)।
- আইপি (IP – Internet Protocol): এর কাজ হলো মূলত অ্যাড্রেসিং এবং রুটিং নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, প্রতিটি প্যাকেটের উপর সঠিক প্রেরক ও প্রাপকের আইপি অ্যাড্রেস লেখা এবং রাউটারগুলোকে পথ দেখিয়ে দেওয়া।
- টিসিপি (TCP – Transmission Control Protocol): এর কাজ হলো ডেটা যেন নির্ভরযোগ্যভাবে এবং সঠিক ক্রমে গন্তব্যে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা। টিসিপি ডেটাকে প্যাকেটে ভাগ করে, প্রতিটি প্যাকেটে নম্বর দেয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর টিসিপি আবার প্যাকেটগুলোকে সঠিক ক্রমে সাজিয়ে মূল ডেটা তৈরি করে। যদি কোনো প্যাকেট रास्ते में হারিয়ে যায়, টিসিপি সেটা বুঝতে পারে এবং আবার সেই প্যাকেটটি পাঠানোর অনুরোধ করে। এটি নিশ্চিত করে যে আপনি যে ফাইলটি ডাউনলোড করছেন বা যে ওয়েবসাইটটি দেখছেন, তার সবটুকু অংশ সঠিকভাবে আপনার কাছে পৌঁছেছে।
প্রোটোকল আসলে কী? (What is a Protocol?) সহজ কথায়, প্রোটোকল (Protocol) হলো এক সেট নিয়ম বা পদ্ধতি যা দুটি কম্পিউটার বা ডিভাইসের মধ্যে ডেটা আদান-প্রদান বা যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন মানুষ কথা বলার সময় নির্দিষ্ট ভাষা ও ব্যাকরণ মেনে চলে, তেমনি ডিভাইসগুলোও ইন্টারনেটে যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে চলে। TCP/IP ছাড়াও আরও অনেক প্রোটোকল আছে, যেমন HTTP (ওয়েবসাইট দেখার জন্য), FTP (ফাইল ট্রান্সফারের জন্য), SMTP (ইমেইল পাঠানোর জন্য) ইত্যাদি।
এই প্রোটোকলগুলো কোথায় সংজ্ঞায়িত করা হয়? এই প্রোটোকলগুলো কোনো একক কোম্পানি তৈরি করে না। এগুলো সাধারণত আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড সংস্থা দ্বারা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি হলো আইইটিএফ (Internet Engineering Task Force – IETF)। এই সংস্থাটি ওপেন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে, যা আরএফসি (Request for Comments) নামক ডকুমেন্টে প্রকাশিত হয়। এই আরএফসিগুলোই বিভিন্ন প্রোটোকলের (যেমন TCP, IP, DNS, HTTP) বিস্তারিত বিবরণ এবং নিয়মাবলী নির্ধারণ করে।
সব মিলিয়ে কিভাবে কাজ করে? (একটি বাস্তব উদাহরণ) ধরুন, আপনি আপনার কম্পিউটার থেকে www.example.com
ওয়েবসাইটটি ভিজিট করতে চান।
- ডিএনএস লুকআপ: আপনার ব্রাউজার প্রথমে আপনার আইএসপি-কে দেওয়া ডিএনএস সার্ভারকে জিজ্ঞাসা করে
www.example.com
-এর আইপি অ্যাড্রেস কী। - আইপি প্রাপ্তি: ডিএনএস সার্ভার তার তালিকা থেকে খুঁজে আইপি অ্যাড্রেসটি (ধরা যাক
93.184.216.34
) আপনার কম্পিউটারকে জানায়। - টিসিপি সংযোগ স্থাপন: আপনার কম্পিউটার টিসিপি ব্যবহার করে
93.184.216.34
আইপি অ্যাড্রেসের সার্ভারের সাথে একটি সংযোগ স্থাপনের অনুরোধ পাঠায় (কিছু প্যাকেট আদান-প্রদান হয়, যাকে ‘হ্যান্ডশেক’ বলে)। - এইচটিটিপি অনুরোধ: সংযোগ স্থাপিত হলে, আপনার ব্রাউজার একটি HTTP অনুরোধ (Request) প্যাকেট তৈরি করে, যেখানে লেখা থাকে যে আপনি
www.example.com
-এর হোমপেজটি দেখতে চান। এই প্যাকেটে আপনার আইপি এবং সার্ভারের আইপি অ্যাড্রেস উল্লেখ করা থাকে। - প্যাকেট যাত্রা: প্যাকেটটি আপনার লোকাল নেটওয়ার্ক (ওয়াইফাই রাউটার) হয়ে আপনার আইএসপি-র কাছে যায়। আইএসপি এবং ইন্টারনেটের অন্যান্য রাউটারগুলো প্যাকেটটিকে পথ দেখিয়ে
example.com
-এর সার্ভারের কাছে পৌঁছে দেয়। - সার্ভারের প্রতিক্রিয়া: সার্ভার অনুরোধটি গ্রহণ করে এবং ওয়েবসাইটের ডেটা (HTML, CSS, ছবি ইত্যাদি) টিসিপি/আইপি প্যাকেট আকারে আপনার আইপি অ্যাড্রেসে ফেরত পাঠায়।
- প্যাকেট গ্রহণ ও সাজানো: প্যাকেটগুলো বিভিন্ন পথ ঘুরে আপনার আইএসপি ও রাউটারের মাধ্যমে আপনার কম্পিউটারে ফেরত আসে। টিসিপি নিশ্চিত করে যে সব প্যাকেট এসেছে এবং সেগুলোকে সঠিক ক্রমে সাজিয়ে ব্রাউজারকে দেয়।
- ওয়েবসাইট প্রদর্শন: ব্রাউজার প্রাপ্ত ডেটা ব্যবহার করে ওয়েবসাইটটি আপনার স্ক্রিনে প্রদর্শন করে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে যায় কয়েক সেকেন্ডেরও কম সময়ে!
উপসংহার: ইন্টারনেট সত্যিই এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এর পেছনে থাকা প্রযুক্তিগুলো জটিল হলেও, মূল ধারণাগুলো – ডেটাকে ছোট প্যাকেটে ভাগ করা, প্রতিটি ডিভাইসের জন্য ঠিকানা থাকা, নামের সাথে ঠিকানা মেলানোর ব্যবস্থা, সঠিক পথে প্যাকেট পাঠানো এবং পুরো যোগাযোগকে নিয়মমাফিক পরিচালনা করা – বেশ যৌক্তিক। প্যাকেট, আইপি অ্যাড্রেস, ডিএনএস, রাউটার, আইএসপি এবং টিসিপি/আইপি – এই সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের এই জাদুকরী ইন্টারনেট, যা আমাদের আঙুলের ডগায় এনে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে।
আশা করি, এই সহজ ব্যাখ্যাটি আপনাদের ইন্টারনেট কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে সাহায্য করেছে। ব্যাপারটা কি আসলেই মজার না? আপনার মতামত কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না!